Categories
Uncategorized

ভাস্কর্য বিতর্ক: আলোচনায় সমাধান দেখছে দুই পক্ষই

ভাস্কর্য নিয়ে গত কয়েক দিন ধরে দেশে তুমুল বিতর্ক হচ্ছে। হেফাজতে ইসলামসহ ধর্মভিত্তিক দলগুলো ভাস্কর্যকে মূর্তির সঙ্গে তুলনা করে এর

বিরুদ্ধে আন্দোলন করছে। অন্যদিকে সরকার বলছে, ভাস্কর্য আর মূর্তির মধ্যে পার্থক্য রয়েছে। বঙ্গবন্ধুর যে ভাস্কর্য নির্মাণ করা হচ্ছে সেটি মূর্তি নয়। এই বিতর্কের মধ্যেই কুষ্টিয়ায় বঙ্গবন্ধুর নির্মাণাধীন একটি ভাস্কর্য ভাঙচুরের ঘটনা ঘটে। এই ঘটনায় ইতিমধ্যে মাদ্রাসার ছাত্র-শিক্ষক

চারজনকে গ্রেপ্তার করেছে পুলিশ। ভাস্কর্য ইস্যুতে উগ্র বক্তব্য দেয়ায় তিনজন শীর্ষ আলেমের বিরুদ্ধে রাষ্ট্রদ্রোহী মামলাও করেছে মুক্তিযুদ্ধের মঞ্চ নামক সংগঠনের একজন নেতা। তবে সরকার ও ইসলামপন্থীদের মুখোমুখি এই অবস্থানে উভয় পক্ষই আলোচনায় সমাধান দেখছে। দুই পক্ষই আলোচনার কথা বলছে। বিবিসি বাংলার খবরে বলা হয়, ভাস্কর্যের বিরুদ্ধে অবস্থান নেয়া ইসলামপন্থী কয়েকটি দল এবং হেফাজতে ইসলামের

পক্ষ থেকে সরকারের সঙ্গে আলোচনায় বসার জন্য উদ্যোগ নেয়া হয়েছে বলে জানা গেছে। এই উদ্যোগে দুই পক্ষের মধ্যে যোগাযোগ বা কথাবার্তা চলছে। তবে সরকার বা ক্ষমতাসীন আওয়ামী লীগ ভাস্কর্যবিরোধীদের ওপর রাজনৈতিক দিক থেকেও একটা চাপ রাখার কৌশল নিয়ে এগুচ্ছে। সম্প্রতি রাজধানীর ধোলাইপাড়ে জাতির জনক বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর

রহমানের নির্মাণাধীন ভাস্কর্যের বিরোধিতা করে ইসলামপন্থী কয়েকটি দল এবং সংগঠন। খেলাফত মজলিস, ইসলামী আন্দোলন বাংলাদেশ ও হেফাজতে ইসলাম সমাবেশ-মিছিলসহ বিভিন্ন কর্মসূচিও পালন করেছে। এসব দল বা সংগঠনের নেতারা এবং ইসলামি চিন্তাবিদরা মিলে ভাস্কর্যবিরোধী ফতোয়াও দিয়েছেন। অন্যদিকে আওয়ামী লীগ এবং তাদের সমমনারা রাজপথে সমাবেশ মিছিল অব্যাহত রেখে ভাস্কর্যবিরোধীদের বিরুদ্ধে শক্ত অবস্থান তুলে ধরছে। দু’পক্ষই যখন যার যার অবস্থানে অনড় রয়েছে,

তখন আলোচনার মাধ্যমে সমাধান সম্ভব কি না-সেই প্রশ্নও রয়েছে। ‘এটা আমাদের ধর্মীয় ইস্যু’ দেশে কওমি মাদ্রাসাগুলোর সবচেয়ে বড় শিক্ষাবোর্ড বেফাকের চেয়ারম্যান মাহমুদুল হাসান। ভাস্কর্যবিরোধী ইসলামপন্থী একটি দলের নেতা জানিয়েছেন, সরকারের সঙ্গে আলোচনার বা বৈঠকের সুযোগ সৃষ্টির জন্য মাহমুদুল হাসানকে তারা দায়িত্ব দিয়েছেন। সেই প্রেক্ষাপটে মাহমুদুল

হাসান উদ্যোগ নিয়েছেন সরকারের স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয় এবং ধর্ম মন্ত্রণালয়ের সাথে কথাবার্তা বলতে। তিনি আরও বলেছেন, তারা সমস্যা সমাধানে প্রধানমন্ত্রীর সঙ্গে বৈঠক করতে চেয়েছেন। প্রধানমন্ত্রীর সঙ্গে বৈঠক হলে ইসলামপন্থীদের পক্ষে কারা তাতে অংশ নেবেন, মাহমুদুল হাসান সেই তালিকাও তৈরি করছেন। তবে এর আগে সমাধানের একটা উপায় বের করতে এখন দু’একদিনের মধ্যে প্রাথমিকভাবে স্বরাষ্ট্রমন্ত্রীর সাথে তাদের বৈঠক হতে পারে। সরকারের পক্ষ থেকে তাদের এমনটা জানানো হয়েছে বলে তিনি উল্লেখ করেছেন। মাহমুদুল হাসান বিবিসিকে বলেছেন,

তারা আলোচনার মাধ্যমে শান্তিপূর্ণ সমাধানের চেষ্টা করছেন। হেফাজতে ইসলামের সিনিয়র নায়েবে আমির আব্দুর রব ইউসুফী বলেছেন, ‘আমাদের সাথে সরকারের যোগাযোগ হচ্ছে। এটা আলোচনার মাধ্যমে সমাধান হবে-তা আমরা বিশ্বাস করি।’ তবে তিনি ভাস্কর্যের বিরুদ্ধে তাদের অবস্থানকেই তুলে ধরেন। একই সাথে অবশ্য তিনি বলেছেন, ‘আমরা সরকারকে বোঝাতে চাচ্ছি যে, এখানে বঙ্গবন্ধু ইস্যু নয়। বঙ্গবন্ধুর নামে কোনো কিছু হোক, তাতে আমাদের আপত্তি নাই। কিন্তু ভাস্কর্য বা মূর্তি

আমাদের ধর্মে নেই। এটা আমাদের ধর্মীয় ইস্যু। এই কথাটিই আমরা বলছি।’ ইসলামী আন্দোলনের আমির সৈয়দ রেজাউল করীম তাদের অবস্থানের পক্ষে যুক্তি দিতে গিয়ে বলেছেন, ‘ইসলাম বা শরিয়তের দৃষ্টিতে বিষয়টা কী-সেটা আমরা তুলে ধরেছি। এখন সরকার জনগণের মনোভাব বুঝে সিদ্ধান্ত নেবে, সেটাই সরকারের দায়িত্ব। কিন্তু কোনো কোনো মহল আলেমদের বিরুদ্ধে নানা রকম বক্তব্য দিয়ে একটা অস্থির পরিস্থিতি সৃষ্টির চেষ্টা করছে।’ তিনিও মনে করেন, সরকারের উচ্চ পর্যায়ের সাথে বৈঠক হতে পারে।

আলোচনা নিয়ে সরকারের অবস্থান ধর্ম প্রতিমন্ত্রী ফরিদুল হক বিবিসির সাথে আলাপকালে আলোচনার মাধ্যমে সমস্যার সমাধানের বিষয়ে গুরুত্বারোপ করেছেন। তিনি বলেছেন, ইসলামপন্থী দল এবং সংগঠনগুলোর আলোচনার প্রস্তাবে সরকারের উচ্চপর্যায় থেকে ইতিবাচক মনোভাব দেখানো হয়েছে। এখন অনানুষ্ঠানিক আলোচনা বা যোগাযোগ হচ্ছে।

‘আলোচনা হচ্ছে ওলামা মাশায়েখদের সাথে। মাননীয় প্রধানমন্ত্রী হস্তক্ষেপ করেছেন। মাননীয় প্রধানমন্ত্রী একটা শান্তিপূর্ণ সমাধান করবেন। এটা নিয়ে বিতর্কের কিছু নেই। বিতর্ক সৃষ্টির কোন সুযোগ নেই। যতটুকু হয়েছে, এটা আর বেশি কিছু হওয়ার সুযোগ আছে বলে আমি মনে করি না’- বলেছেন ধর্ম প্রতিমন্ত্রী। ইসলামিক ফাউন্ডেশনের একটি সূত্র জানিয়েছে,

গত সোমবার ইসলামিক ফাউন্ডেশনের মহাপরিচালক ১২ জন ইসলামি চিন্তাবিদের সাথে বৈঠক করে পরামর্শ নিয়েছেন। এর ভিত্তিতে ফাউন্ডেশন একটি প্রতিবেদন তৈরি করে তা সরকারকে দেবে। একজন সিনিয়র মন্ত্রীও বলেছেন, আলোচনার মাধ্যমেই সমাধান হতে পারে। একাধিক মন্ত্রীর সাথে কথা বলে এমন ধারণা পাওয়া যায়, যে উত্তপ্ত

পরিস্থিতি হয়েছে, তা তারা আর বাড়তে দিতে চান না। কিন্তু শেখ মুজিবের ভাস্কর্য নির্মাণ বন্ধ করতেও সরকার রাজি নয়। আওয়ামী লীগের রাজনৈতিক কৌশল দলটির একাধিক সিনিয়র নেতা বলেছেন, ইসলামপন্থী কয়েকটি দল এবং হেফাজতে ইসলাম হঠাৎ করে ভাস্কর্যের বিরুদ্ধে কেন মাঠে নেমেছে, এর পেছনে রাজনৈতিক কোনো উদ্দেশ্য আছে কি না-

এসব প্রশ্ন তাদের দলে উঠেছে। এছাড়া তারা মনে করেন, তাদের আদর্শের প্রধান ভিত্তি শেখ মুজিবের ওপর আঘাত করা হয়েছে। এরই মাঝে কুষ্টিয়ায় শেখ মুজিবের নির্মাণাধীন একটি ভাস্কর্য ভাঙচুরের ঘটনা ঘটেছে। এসব ঘটনার প্রেক্ষাপটে প্রতিবাদ না করলে তাদের রাজনীতি প্রশ্নের মুখে পড়বে। আওয়ামী লীগের মাঠ পর্যায়ে এবং সিনিয়র নেতাদেরও একটা অংশ ভাস্কর্যবিরোধীদের সাথে কোন আলোচনায় না গিয়ে আইনগত এবং রাজনৈতিকভাবে পরিস্থিতি মোকাবেলা করার পক্ষে বলে মনে হয়েছে। দলটির যুগ্ম সাধারণ সম্পাদক মাহবুব-উল আলম হানিফ বলেছেন,

‘ভাস্কর্য বিরোধিতার পেছনে বাংলাদেশের স্বাধীনতাবিরোধী শক্তির ভূমিকা রয়েছে বলে আমরা বিশ্বাস করি। উগ্রপন্থীরা মাঠে নেমেছে। এখানে তাদের সাথে আলোচনা করা ঠিক নয়।’ ফলে সরকারে আলোচনার কথা যেমন রয়েছে, একইসাথে রাজনৈতিক এবং আইনগতভাবে এগুনোর কৌশলের ব্যাপারে ইঙ্গিত পাওয়া যাচ্ছে। কুষ্টিয়ায় ভাস্কর্য ভাঙচুরের ঘটনায় সন্দেহভাজন চারজনকে গ্রেপ্তারের পর আইনগতভাবে কঠোর ব্যবস্থা নেয়ার কথা সরকার বলেছে। অন্যদিকে আওয়ামী লীগ, তাদের সহযোগী সংগঠনগুলো এবং শিক্ষক-সাংবাদিক-চিকিৎসকসহ বিভিন্ন পেশায় থাকা তাদের সমর্থকরা সমাবেশ-মানববন্ধন করে প্রতিবাদ অব্যাহত রেখেছেন। দলটির নেতারা মনে করেন, অব্যাহত প্রতিবাদ কর্মসূচির মাধ্যমে

তারা একটা রাজনৈতিক চাপ তৈরি করতে পেরেছেন। তাদের পক্ষের সমর্থকদের মধ্যে আবার একটা ঐক্য সৃষ্টি হয়েছে। সূত্র: বিবিসি বাংলা

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *