Categories
Uncategorized

দিনাজপুরে সংসারের হাল ধরতে ভ্যান চালায় ছোট্ট শিশু জুঁই

দিনাজপুরের পার্বতীপুর উপজেলার হরিরামপুর ইউনিয়নের আকন্দ পাড়া গ্রামের শিশু জুঁই মনি। তার বাবা জিয়াউল হক দৃষ্টি প্রতিবন্ধী।

সংসারের হাল ধরতে জুঁই নিয়ন্ত্রণ করে চলছে ব্যাটারিচালিত ভ্যানের হ্যান্ডেল। জুঁই পার্বতীপুরের দক্ষিণ মধ্যপাড়া কমিউনিটি সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়ের চতুর্থ শ্রেণির ছাত্রী। ভ্যান চালিয়ে তার যা রোজগার হয়, তা দিয়ে চলে তাদের পরিবারের পাঁচ সদস্যের খরচ। তার বাবা জন্ম থেকে

চোখে অল্প অল্প দেখতেন। তিনি বনের পাতা কুড়িয়ে সংসার চালাতেন। কিন্তু তিন বছর বছর ধরে চোখে কিছুই দেখতে পাননা জিয়াউল হক। স্বাভাবিক চলাচলেও অক্ষম হয়ে পড়েছেন। এরই মধ্যে বড় মেয়ে রোমানা আক্তারের বিয়ে হয়ে যায়। অভাবের সংসারের হাল ধরতে দুই বছর হলো ছোট মেয়ে জুঁই মনি শুরু করে ভ্যান চালানো। জিয়াউল হক বলেন, ‘চোখে দেখতে না পারায় আমি অচল। এক বেলা খেলে, আরেক

বেলা না খেয়ে থাকতে হয়। এমন অবস্থায় ছোট মেয়েটি ভ্যান চালাতে শুরু করেছে।’ মধ্যপাড়া বাজারে গিয়ে দেখা গেছে, জুঁই মনি ব্যাটারিচালিত ভ্যানগাড়ি নিয়ে রয়েছে যাত্রীর অপেক্ষায়।জুঁই জানায়, গাড়ি ভালোই চালায় সে। ভাড়া নিয়ে পার্বতীপুর, ফুলবাড়ী ও বদরগঞ্জ শহরের বিভিন্ন স্থানে যায়। এভাবেই চলছে তার জীবনযুদ্ধ। তাদের বাড়িতে গিয়ে দেখা যায়, বন বিভাগের জায়গায় টিন দিয়ে ঘিরে ঘর বানিয়েছে তারা। সেই ঘরে তাদের বসবাস। নিজেদের এক

শতক জমি নেই তাদের। জুঁই মনির মা শাহারা বানু জানান, তিনটি এনজিও থেকে লোন নিয়ে বন বিভাগের জায়গায় এই টিন সেডের বাড়ি করেছেন এবং ভ্যানগাড়ি কিনেছেন। সপ্তাহের তিন হাজার ৭০০ টাকা কিস্তি ও পরিবারে সদস্য খচর সবটাই মেয়ে জুঁই চালাচ্ছে। মেয়ের বাবা প্রতিবন্ধী ভাতার টাকা পায় এই দিয়ে কোনো রকমে চলে তাদের সংসার।

তিনি বলেন, ‘ভ্যান চালানোর কারণে প্রথম দিকে গ্রামবাসী তার মেয়েকে নিয়ে নানা কথা বলত। মেয়ে মানুষ হয়ে ভ্যান গাড়ি চালায়। মেয়েকে বিয়ে করবে কে, তখন খুব খারাপ লাগত। এ নিয়ে ঘরে বসে কান্নাও করতাম। তবে এখন আমি মেয়ের জন্য গর্ব করি।’ জুঁই মনি জানায়, ‘মা-বাবার কষ্ট দেখে খারাপ লাগত। আমরা চার বোন, এক ভাই অনেক সময় না খেয়েও থেকেছি। টাকার অভাবে অনেক সময় মুখে খাবার

জুটতো না। পরে নিজেই ভ্যান চালানো শুরু করি। ভ্যান চালিয়ে দৈনিক ৩০০ থেকে সাড়ে ৪০০ টাকা রোজগার হয়।’ জুঁই আরও জানায়, ‘আমার পড়ালেখা করতে ভালো লাগে। শত কষ্ট হলেও পড়ালেখা শেষ করতে চাই।’ জুঁই মনির স্কুলের প্রধান শিক্ষক আনোয়ার হোসেন বলেন, ‘জুঁই অত্যন্ত নম্র, বিনয়ী ও মিশুক মেয়ে। সে লেখাপড়ার পাশাপাশি ভ্যান চালায়। ছাত্রী হিসেবেও ভালো। এই বয়সে সে পরিবারের দায়িত্ব কাঁধে তুলে নিয়েছে। মেয়ে হয়েও অনেক কিছু করা যায়, সেটার দৃষ্টান্ত জুঁই। মেয়েটির কাছ থেকে এখনকার

ছেলেমেয়েদের শেখার আছে। লেখাপড়াতে ও খেলাধুলায় সে খুব ভালো।’ তিনি আরও জানান, চিকিৎসার জন্য হাসপাতালে গিয়েছিলেন জুঁই মনির বাবা। হাসপাতাল থেকে তিনি জানতে পেরেছেন, তার চোখের জন্য অপারেশন করতে হবে। অনেক টাকা দরকার। মেয়ের আয়ে কোনোমতে চলে সংসার ও তার চিকিৎসা। অপারেশনের টাকা কোথায় পাবে, সেটা ভেবেই দুর্বিষহ দিন কাটছে তাদের। হরিরামপুর ইউনিয়নের আকন্দপাড়ার গ্রামের ইউপি সদস্য রাহিনুল হক বলেন, ‘জুঁইয়ের পরিবারকে ইউনিয়ন পরিষদ থেকে সহযোগিতা

করার সাধ্যমতো চেষ্টা করছি। তবে সমাজের বিত্তবানরা তাদের পাশে দাঁড়ালে ওই পরিবারটির অনেক উপকার হবে।

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *